ছবিঃ সংগৃহীত
নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর বুকে ঢেউ আর বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুলের সারি—শরতের এমন মনোমুগ্ধকর রূপে মুগ্ধ হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের দর্শনার্থীরা। মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ চরে প্রায় ২২০ একর এলাকাজুড়ে ফুটে থাকা কাশফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। প্রতিদিনই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে সেখানে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ।
সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ভাটিবন্দর ও কান্দারগাঁওয়ের মাঝামাঝি মেঘনা নদীর একটি চরে ফুটেছে এই কাশফুল। নদীর জলরাশি, বিস্তীর্ণ চর আর কাশবনের শুভ্রতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। বিশেষ করে বিকেলের দিকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ কাশবনের ভেতর ছবি তুলছেন, কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত, আবার কেউ নদীর পাড়ে বসে উপভোগ করছেন শরতের স্নিগ্ধ পরিবেশ।
শিশুকন্যাকে নিয়ে কাশফুল দেখতে আসা দম্পতি মামুন ও মৌসুমি বলেন, ছাত্রজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে কাশফুল নিয়ে অনেক আনন্দ করেছেন তাঁরা। কাশফুল ছিঁড়ে ফুঁ দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার স্মৃতি এখনো তাঁদের মনে দোলা দেয়। একসময় কাশফুলের শুভ্রতা আর নীল আকাশের মেলবন্ধন তাঁদের আনন্দ দিত। এখন সন্তানদের মধ্যেও সেই আনন্দ দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে জায়গাটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। এখানে এলে শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো যায়। নদীর নির্মল বাতাস আর বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের দৃশ্য তাঁদের মুগ্ধ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সেজান আহমেদ বলেন, শরৎ এলেই প্রতিবছর এই চরে কাশফুল ফোটে। ফুল ফোটার পর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ঘুরতে আসেন। কয়েক মাস ধরে দর্শনার্থীদের আনাগোনায় জমজমাট থাকে এলাকাটি।
দর্শনার্থীদের ঘিরে চরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট খাবারের দোকান। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা খাবারসহ নানা পণ্য বিক্রি করছেন। এতে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য মৌসুমি উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাশবন ও আশপাশের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাশফুল শরৎকালের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফুল ঝরে যায়, বদলে যায় চরের চেহারা। তাই অল্প সময়ের জন্য পাওয়া প্রকৃতির এই সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন সচেতনতা।
সোনারগাঁ উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, কাশবন শরৎকালের একটি স্বাভাবিক ও নান্দনিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। তবে দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত পদচারণা, কাশফুল ও অন্যান্য গাছপালা নষ্ট করা এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলার কারণে এ ধরনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দর্শনার্থীদের পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং কাশবন নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ায় জমির মালিকদের অধিকার বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে পরিবেশবান্ধব উপায়ে এর সৌন্দর্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মেঘনার এই চর শরৎকালে সোনারগাঁয়ের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর সৌন্দর্য ধরে রাখা সম্ভব। ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া এই কাশবন এখন সোনারগাঁয়ের সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক পর্যটনস্থল হিসেবেও পরিচিতি পাওয়ার অপেক্ষায়।